ছাগল পালনঃ
বাণিজ্যিক ছাগলের খামার
স্থাপনে বিবেচ্য বিষয় সমূহ:
দারিদ্র্য বিমোচনে ছাগল পালন প্রকল্প
ছাগল বাংলাদেশের অতি
গুরুত্বপূর্ণ পশুসম্পদ। ছাগল আমাদের দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম প্রধান
উৎস। বাংলাদেশে বেকার সমস্যা ও দারিদ্র্য হ্রাস মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি ও বৈদেশিক
মূদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে ছাগল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য যে
এদেশের মোট প্রায় আড়াই কোটি ছাগলের অধিকাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের।
★ ছাগল পালনের সুবিধাদিঃ
* ছোট প্রাণীর খোরাক তুলনামূলকভাবে অনেক
কম, পালনের জন্য অল্প জায়গা লাগে এবং মূলধনও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে।
* গবাদিপশুর তুলনায় ছাগলের রোগবালাই
কম।
* তুলনামূলক কম সময়ে অধিক সংখ্যক বাচ্চা
পাওয়া যায়। বছরে দুইবার বাচ্চা প্রসব করে এবং প্রতিবারে গড়ে ২-৩ টি বাচ্চা হয়ে
থাকে।
* দেশে ও বিদেশে ব্ল্যাক ছাগলের চামড়া,
মাংস ও দুধের বিপুল চাহিদা আছে।
* ছাগলের দুধ যক্ষ্মা ও হাঁপানি রোগ প্রতিরোধক
হিসাবে জনশ্রুতি রয়েছে এবং এজন্য এদের দুধের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।
* ছাগল ভূমিহীন ক্ষুদ্র ও মাঝারী চাষীদের
অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়।
★ যমুনাপাড়ি ছাগল...
যমুনাপাড়ি ছাগল বিদেশি
জাতের ছাগল। যমুনা পাড়ি ছাগল কে আমরা রাম ছাগল বলে ডাকি। যমুনাপুরী জাতের ছাগল
উত্তরপ্রদেশের যমুনা, গঙ্গা ও চম্বল নদীর মধ্যবর্তী এটোয়া জেলায় এবং আগ্রা ও মথুরা
জেলায় দেখা যায়।বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এ জাতের ছাগল পাওয়া যায়। এরা মাংস
ও দুধ উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। সংকরায়নের কাজে অন্যান্য দেশী জাতের সহিত এদের মিলন
করানো হয়।
যমুনাপাড়ি ছাগলের বৈশিষ্টঃ-
·
এদের
শরীরের রং সাদা, কালো , হলুদ বাদামী বা বিভিন্ন রঙয়ের সংমিশ্রণে হতে পারে।
·
যমুনা
পাড়ি ছাগলের শরীরের গঠন লম্বাটে। পা খুব লম্বা এবং পিছনের পায়ের পেছন দিকে লম্বা
লোম আছে। এদের পা বেশ লম্বা; পেছনে লম্বা লোম থাকে।
·
এদের
কান লম্বা ও ঝুলন্ত। সাধারনতঃ ৭-১০ ইঞ্চির অধিক ঝুলন্ত কান দেখা যায়।
·
ছাগীর
ওলান বেশ বড়, সুগঠিত ও ঝুলন্ত। বাটগুলো মোটা ও লম্বা।
·
শিং
চ্যাপ্টা ও খাটো ও বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে।
·
শরীরের
উচ্চতা ৩২-৪০ ইঞ্চির অধিক হতে পারে।
·
একটি
পূর্ণবয়স্ক পাঁঠার ওজন ৬০-৯০ কেজি এবং ছাগীর ওজন ৪০-৬০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
·
এরা
অত্যন্তও কষ্টসহিষ্ণু ও চঞ্চল।
·
এরা
দেরিতে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।
·
যমুনা
পাড়ি জাতের ছাগী বছরে একবার বাচ্চা দেয় এবং বছরে ১-২ টি বাচ্চা প্রসব করে।
প্রতিবার গর্ভধারন করে।
·
যমুনাপাড়ি
জাতের ছাগলের দুধ প্রদান ক্ষমতা খুবই বেশি।
·
প্রতিদিন
প্রায় ১.৫-২ কেজির অধিক দুধ দেয়।
·
দুধে
প্রায় ৪ – ৫ ভাগ ফ্যাট থাকে।
·
এদের
মাংশ ব্লাকবেঙ্গল ছাগলের মতো সুস্বাদু নয় এবং চামড়া ও উন্নত মানের নয়। তবু দুধ ও
মাংশ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে এদেশে যমুনা জাতের ছাগল পালন করা হয়।
·
এর
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্লাকবেঙ্গল ছাগলের মতো নয়।
★ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের
বৈশিষ্ট্যঃ
ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের
বক্ষস্থল চওড়া, কান কিছুটা উপরের দিকে ও শিং ছোট থেকে মাঝারী আকৃতির হয়ে থাকে।
দেহের গড়ন আটসাট পা অপেক্ষাকৃত খাটো ও এবং লোম মসৃন হয়।
ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল
পালনের সুবিধাঃ
সাধারণতঃ ১২-১৫ মাস বয়সে
প্রথম বাচ্চা দেয়। একটি ছাগী বছরে দুইবার বাচ্চা প্রসব করলেও উপযুক্ত
ব্যবস্থাপনায় ছাগী ২-৮ টি পর্যন্ত বাচ্চা পাওয়া যেতে পারে। ২০ কেজি দৈহিক ওজন
সম্পন্ন একটি ছাসী থেকে কমপক্ষে ১১ কেজি খাওয়ার যোগ্য মাংস এবং ১.-১.৪ কেজি ওজনের
অতি উন্নতমানের চামড়া পাওয়া যায়। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া একটি অতি
মূল্যবান উপজাত। দেখা গেছে, সেমি-ইন্টেনসিভ পদ্ধতিতে ২৫টি ছাগীর খামার থেকে ১ম
বছরে ৫০,০০০ টাকা, ২য় বছরে ৭৫,৩৩৭ এবং ৩য় বছরে ১,০২,৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব
(সূত্রঃ ছাগল পালন ম্যানুয়েল)।
ছাগল ক্রয়ের ক্ষেত্রে
বিবেচ্য গুণাবলীঃ
পাঠাঁর ক্ষেত্রেঃ
* পাঠাঁর বয়স ১২ মাসের মধ্যে হতে হবে,
অন্ডকোষের আকার বড় এবং সুগঠিত হতে হবে।
* পিছনের পা সুঠাম ও শক্তিশালী হতে হবে।
* পাঠাঁর মা, দাদী বা নানীর বিস্তারিত
তথ্যাদি (অর্থাৎ তারা বছরে ২ বার বাচ্চা দিত কীনা, প্রতিবারে একটির বেশি বাচ্চা হতো
কীনা, দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ইত্যাদি গুণাবলী) সন্তোষজনক বিবেচিত হলেই ক্রয়ের ব্যবস্থা
নেয়া যেতে পারে।
ছাগীর ক্ষেত্রেঃ
* নির্বাচিত ছাগী হবে অধিক উৎপাদনশীল
বংশের ও আকারে বড়।
* নয় বা বার মাস বয়সের ছাগী (গর্ভবতী
হলেও কোনো সমস্যা নেই) কিনতে হবে।
* ছাগীর পেট তুলনামূলকভাবে বড়, পাজরের
হাড়, চওড়া, প্রসারিত ও দুই হাড়ের মাঝখানে কমপক্ষে এক আঙ্গুল ফাঁকা জায়গা থাকতে
হবে।
* নির্বাচিত ছাগীর ওলান সুগঠিত ও বাঁট
সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
★ বয়স নির্ণয়ঃ
ছাগলের দাঁত দেখে বয়স
নির্ধারণ করতে হয়। বয়স ১২ মাসের নিচে হলে দুধের সবগুলোর দাঁত থাকবে, ১২-১৫ মাসের
নিচে বয়স হলে স্থায়ী দাঁত এবং ৩৭ মাসের ঊর্ধ্বে বয়স হলে ৪ জোড়া স্থায়ী দাঁত
থাকবে।
স্বাস্থ্য সম্পর্কিত
বিষয়াদিঃ
গ্রহণযোগ্য ছাগল অবশ্যই
সকল ধরনের সংক্রামক ব্যাধি, চর্মরোগ, চক্ষুরোগ, যৌনরোগ ও বংশগত রোগমুক্ত হতে হবে।
পিপিআর খুবই মারাত্মক রোগ বিধায় কোনো এলাকা থেকে ছাগল সংগ্রহ করার আগে উক্ত
এলাকায় পিপিআর রোগ ছিল কীনা তা জানতে হবে। উক্ত এলাকা কমপক্ষে ৪ মাস আগে থেকে
পিপিআর মুক্ত থাকলে তবেই সেখান থেকে ছাগল সংগ্রহ করা যেতে পারে।
ছাগল ক্রয়ঃ
সাধারণত যমুনা ও
ব্রহ্মপুত্রের চর অঞ্চল, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, বগুড়ার
ধুনট, ফরিদপুর, মেহেরপুর ও কয়েকটি স্থানে উন্নতমানের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পাওয়া
যায়। এসব স্থান থেকে ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ছাগল ক্রয় করা যেতে
পারে।
বাছাইকৃত ছাগলের পরিবহন
ব্যবস্থাঃ
নির্বাচিত ছাগলকে পূর্বে
পিপিআর ভ্যাকসিন দেয়া না থাকলে পরিবহনের ২১ দিন পূর্বে পিপিআর ভ্যাকসিন দিতে হবে।
পরিবহনের পূর্বে ছাগলকে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ ও চিটাগুড় মিশ্রিত পানি (পানি ১
লিটার, লবণ ১০ গ্রাম ও চিটাগুড় ৩০ গ্রাম) খাওয়াতে হবে। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা
কিংবা ঝড়-বৃষ্টিতে এদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবহন করা মোটেও উচিত নয়।
জৈব নিরাপত্তাঃ
খামার এলাকার বেড়া বা
নিরাপত্তা বেস্টনী এমনভাবে নির্মান করতে হবে যাতে সেখানে অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি, শেয়াল-কুকুর
ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্রবেশ করতে না পারে। প্রবেশপথে ফুটবাথ বা পা ধোয়ার জন্য
ছোট চৌবাচ্চায় জীবাণুনাশক মেশানো পানি রাখতে হবে। খামারে প্রবেশের আগে খামারে
গমনকারী তার জুতা/পা ডুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করবেন। খামারের জন্য সংগৃহীত নতুন ছাগল
সরাসরি খামারে পূর্বে বিদ্যমান ছাগলের সাথে রাখা যাবে না। নূতন আনীত ছাগলদেরকে
স্বতন্ত্র ঘরে সাময়িকভাবে পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ধরনের ঘরকে পৃথকীকরণ ঘর বা
আইসোলেশন শেড বলে। অন্ততপক্ষে দুই সপ্তাহ এই শেডে রাখা বিশেষ জরুরি। এসব ছাগলের
জন্য প্রাথমিক কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমে এদেরকে কৃমিনাশক খাওয়াতে
হবে। এজন্য বহিঃপরজীবী এবং আন্তঃ পরজীবীর জন্য কার্যকর কৃমিনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
চর্মরোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতিটি ছাগলকে (০.৫%) শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ
ম্যালাথিয়ন দ্রবণে গোসল করাতে হবে। আইসোলেশন শেডে ছাগল রাখার পর ১৫ দিনের মধ্যে
যদি কোনো রোগ না দেখা দেয় তাহলে প্রথমে পিপিআর রোগের ভ্যাকসিন এবং সাত দিন পর
গোটপক্সের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে। শেষ টিকা প্রদানের সাত দিন পর এসব ছাগলকে
মূল খামারে নেয়া যেতে পারে। প্রতিদিন সকাল এবং বিকালে ছাগলের ঘর পরিষ্কার করতে
হবে। কোনো ছাগল যদি অসুস্থ হয় তাহলে তাকে আলাদা করে আইসোলেশন শেডে রেখে চিকিৎসার
ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোনো ছাগল মারা যায় তবে অবশ্যই তার কারণ সনাক্ত করতে হবে।
ল্যাবরেটরিতে রোগ নির্ণয়ের পর তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বিশেষ করে অন্যান্য
ছাগলের অন্য নিতে হবে। মৃত ছাগলকে খামার থেকে দূরে নিয়ে মাটির গভীরে পুতে বা আগুন
দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগাক্রান্ত ছাগলের ব্যবহার্য সকল সরঞ্জামাদি ও
দ্রব্যাদি সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
ছাগলের বাসগৃহঃ
ছাগলের ঘর শুষ্ক, উচুঁ,
পানি জমে না এমন স্থানে স্থাপন করা উচিত। পূর্ব পশ্চিমে লম্বালম্বি, দক্ষিণ দিক
খোলা এমন করতে হবে। এক্ষেত্রে কাঠাঁল, ইপিল ইপিল, কাসাভা ইত্যাদি গাছ লাগানো যেতে
পারে। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের জন্য উত্তম ব্যবস্থা আছে এমন স্থানকে অগ্রাধিকার
দিতে হবে। ছাগল ঠাসাঠাসি অবস্থায় বাস করতে পছন্দ করে না। এরা মুক্ত আলো বাতাস এবং
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে থাকতে পছন্দ করে। এক জোড়া ছাগলের জন্য ৫ ফুট লম্বা,
১.৫ ফুট চওড়া এবং ৬ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট খোয়াঁড় প্রয়োজন। প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক
ছাগলের জন্য গড়ে ১০-১৪ বঃ ফুট এবং বাড়ন্ত বাচ্চার জন্য ৩-৮ বঃ ফুট জায়গা
প্রয়োজন। ছাগলের ঘর ছন, গোলপাতা, খড়, টিন বা ইট নির্মিত হতে পারে। তবে ঘরের ভিতর
বাঁশ বা কাঠের মাচা প্রস্তুত করে তার উপর ছাগল রাখা উচিত। মাচার উচ্চতা ১ মিটার
(৩.৩৩ ফুট) এবং মাচা থেকে ছাদের উচ্চতা ৬-৮ ফুট হবে। মল-মূত্র নিষ্কাষনের গোবর ও
চনা সুবিধার্থে বাঁশের চটা বা কাঠের মাঝে ১সেঃ মিঃ ফাক লাখতে হবে। মেঝে মাটির হলে
সেখানে পর্যাপ্ত বালি দিতে হবে। বৃষ্টি যেন সরাসরি ঘরের ভিতর প্রবেশ না করতে পারে
সে জন্য ছাগলের ঘরের চালা ১-১.৫ মিঃ (৩-৩.৫ ফুট) ঝুলিয়ে দেয়া প্রয়োজন। শীতকালে
রাতের বেলায় মাচার উপরের দেয়ালকে চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। পাঠাঁর জন্য
অনুরূপভাবে পর্যাপ্ত আলো বাতাস ও মল-মূত্র নিষ্কাষনের উত্তম সুবিধাযুক্ত পৃথক
খোয়াড় তৈরি করতে হবে। শীতকালে মাচার উপর ১.৫ ইঞ্চি পুরু খড় বিছিয়ে তার উপর
ছাগল রাখতে হবে। প্রতিদিন ভালোভাবে পরিষ্কার করে রৌদ্রে শুকিয়ে পুনরায় বিছাতে
হবে।
ছাগলের ঘরের অবস্থান :-----
পূর্ব পশ্চিম লম্বালম্বি দক্ষিণ
দিক খোলামেলা স্থানে ঘর নির্মাণ করা উচিত ।খামারের তিন দিকে ঘেরা পরিবেশ,বিশেষ করে
উত্তর দিকে গাছপালা লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে কাঁঠাল, ইপিল ইপিল, কাসাভা ইত্যাদি গাছ লাগানো
যেতে পারে ।ছাগল কামারের স্থান নির্বাচনে অবশ্যই অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং উত্তম পানি নিষ্কাশনের
ব্যবস্থা আছে এমন স্থানকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ঘরের আয়তন: -----
প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক ছাগলের জন্য গড়ে 1.0×1.5 বঃ মিঃ বা 10-15 বঃ ফুট জায়গা প্রয়োজন ।মোটামুটি
12×18 বঃ মিঃ এলাকায় 100-125 টি বয়স্ক ছাগল
রাখা যায় ।প্রতিটি বাড়ন্ত বাচ্চার জন্য 0.3-0.8 বঃ মিঃ বা 3-8 বঃ ফুট জায়গা প্রয়োজন ।
বাসস্থানের ধরণ:---------
ছাগলের ঘর ছন,গোলপাতা, খড় ,টিন বা ইঁটের গাঁথুনির
দ্বারা তৈরি করা যেতে পারে ।তবে ঘরের ভিতর বাঁশ বা কাঠের মাচা তৈরি করে তার উপর ছাগল
পালন করতে হবে ।মাচার উচ্চতা 01.00 মিটার (3.33ফুট)এবং
মাচা থেকে ছাদের উচ্চতা 1.8 -2.4 মিটার (6-8 ফুট) হবে ।গোবর বা চেনা পড়ার সুবিধার্থে বাঁশের চটা বা কাঠকে 01
সেঃ মিঃ ফাঁকা রাখতে হবে ।মাচার নীচ থেকে গোবর সহজে এবং চেনা সরানোর
জন্য ঘরের মেঝে মাঝ বরাবর উঁচু করে দুই পার্শ্বে ঢালু(2%) রাখতে হবে ।মেঝে মাটির হলে
সেখানে পর্যাপ্ত বালি মাটি দিতে হবে। ছাগলের ঘরের দেয়াল, মাচার নীচের অংশ ফাঁকা এবং
মাচার উপরের অংশ "এম এম ফ্ল্যাক্সিবল"নেট হতে পারে
।বৃষ্টির পানি যেন সরাসরি না ঢুকে সে জন্য ছাগলের ঘরের চালা 1.0- 1.5 মিটার (3.28 -3.77 ফুট) ঝুলিয়ে দেয়া প্রয়োজন ।শীতকালে রাতের বেলায় মাচার উপর দেয়ালকে চট দিয়ে
ঢেকে দিতে হবে ।শীতের সময় মাচার উপর 10- 12 সেঃ মিঃ (4- 5 ইন্চি) পুরু খড়ের বেডিং
বিছিয়ে দিতে হবে।
বাসস্থানের বিন্যাস: -------
বিভিন্ন বয়স ও ধরনের ছাগলকে
ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এবং পাঁঠাকে সবসময় ছাগী থেকে পৃথক করে রাখা উচিত ।দুগ্ধবতী, গর্ভবতী
ও শুষ্ক ছাগীকে একসাথে রাখা যেতে পারে ।তবে বাচ্চা দেওয়ার পর সাত দিন পর্যন্ত ছাগীর
সাথে (চরানোর সময় ছাড়া) বাচ্চাকে রাখা
উচিত ।বাড়ন্ত ছাগল ও খাসী একই জায়গায় রাখা যেতে পারে ।এক্ষেত্রে পৃথকভাবে খাওয়ানোর
ব্যবস্থা থাকতে হবে। শীতকালে বাচ্চাকে রাতের বেলায় মায়ের সাথে ব্রুডিং পেনে রাখতে হবে
।
ব্রুডিং পেন :-------
এটি একটি খাঁচা বিশেষ যা কাঠের
বা বাঁশের তৈরি হতে পারে ।এর চারপাশে চটের বস্তা দিয়ে ঢাকা থাকে ।খাঁচার মেঝে সাধারণ
ছাগলের ঘরের মতো মাচা বিশিষ্ট কিন্তু সেখানে
10 - 12 সেঃ মিঃ পুরু খড়ের বেডিং থাকে । 60×56×60 ঘন সেঃ মিঃ আয়তনের ব্রুডিং পেনে দুই টি ছাগী সহ 4-6 টি বাচ্চা রাখা যায় ।তাপমাত্রা 15 ডিগ্রি সেলসিয়াস
এর নীচে নামলে সেখানে প্রতি খাঁচায় 100 ওয়াটের একটি বাল্ব
জ্বালিয়ে তাপমাত্রা 20 -25 ডিগ্রি সেলসিয়াস এ রাখা যেতে পারে
।
ছাগলের স্বাস্থ্য
ব্যবস্থাপনাঃ
একথা মনে রাখা প্রয়োজন
যে মুক্তভাবে ছাগল প্রতিপালনের তুলনায় আবদ্ধ অবস্থায় ছাগল পালন অনেক বেশি
ঝুকিপূর্ণ। এ ব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা ও প্রযুক্তির সমন্নয় না ঘটালে
খামারীকে বিস্তর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এটা একটি বাস্তব উপলদ্ধি। এজন্য ছাগলের
সুখ-সাচ্ছন্দ্য ও স্বাস্থ্যর প্রতি খামারীকে স্বতন্ত্র ভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।
ছাগলের খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই বিভিন্ন রোগ
দমনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে খামার থেকে লাভের আশা
করা যায় না। খামারে ছাগল আনার পর থেকে প্রতিদিনই প্রতিটা ছাগলের স্বাস্থ্যের দিকে
নজর দিতে হবে। প্রথম পাঁচ দিন সকাল ও বিকালে দুবার থার্মোমিটার দিয়ে ছাগলের দেহের
তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। হঠাৎ কোনো রোগ দেখা মাত্রই পশু চিকিৎসকের সঙ্গে
পরামর্শ করতে হবে। তীব্র শীতের সময় ছাগী বা বাচ্চাদের গায়ে চট পেঁচিয়ে দেয়া
যেতে পারে। মাচার নিচ এবং ঘর প্রতিদিন সকালে পরিষ্কার করতে হবে এবং কর্মসূচি
অনুযায়ী জীবাণুনাশের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুস্থ ছাগলের বৈশিষ্ট্যঃ
সুস্থ ছাগলের নাড়ীর
স্পন্দন প্রতি মিনিটে ৭০-৯০ বার, শ্বাস-প্রশ্বাস প্রতি মিনিটে ২৫-৪০ বার এবং
তাপমাত্রা ৩৯.৫ সেঃ হওয়া উচিত। সুস্থ ছাগল দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে, মাথা সবসময়
উঁচু থাকে, নাসারন্ধ থাকবে পরিষ্কার, চামড়া নরম, পশম মসৃন ও চকচকে দেখাবে এবং
পায়ু অঞ্চল থাকবে পরিচ্ছন্ন।
ছাগল সুস্থ রাখতে যেসব
ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা আবশ্যক সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
কর্মসূচি অনুযায়ী টিকা
প্রদানঃ
ভাইরাসজনিত রোগ যেমন
পিপিআর, গোটপক্স, ক্ষুরারোগ ইত্যাদি এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যেমন এনথ্রাক্স,
ব্রুসেলোসিস ইত্যাদি খুবই মারাত্মক বলে এগুলোর বিরুদ্ধে যথারীতি টিকা প্রদান করতে
হবে। যেসব ছাগীকে পূর্বে পিপিআর, গোটপক্স, একথাইমা, ব্রুসেলোসিস ইত্যাদি টিকা
দেয়া হয়নি তাদেরকে গর্ভের ৫ম মাসে উক্ত ভ্যাকসিনগুলি দিতে হবে। বাচ্চার বয়স যখন
৫ মাস তখন তাকে পিপিআর ভ্যাকসিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিতে হবে।
ছাগলের টিকা প্রদান
কর্মসূচি
কৃমিনাশক ঔষধ প্রয়োগঃ
সকল ছাগলকে নির্ধারিত
মাত্রায় বছরে দুইবার কৃমিনাশক ঔষধ প্রদান করতে হবে। কৃমিনাশক কর্মসূচি অনুসরণের
জন্য পশু চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ
ছাগলকে রাস্তার ধার,
পুকুর পাড়, জমির আইল, পতিত জমি বা পাহাড়ের ঢালে বেঁধে বা ছেড়ে ৮-৯ ঘন্টা ঘাস
খাওয়াতে পারলে খুব উপকার হবে। এ ধরনের সুযোগ না থাকলে প্রতি ২০ কেজি ওজনের ছাগলের
জন্য দৈনিক ০.৫-১ কেজি পরিমাণ কাঠাঁল, ইপিল ইপিল, ঝিকা, বাবলা পাতা অথবা এদের
মিশ্রণ দেয়া যেতে পারে। প্রতিটি ছাগলকে দৈনিক ২৫০-৩০০ গ্রাম ঘরে প্রস্তুতকৃত
দানাদার খাদ্য দেয়া যেতে পারে। ১০ কেজি দানাদার খাদ্য মিশ্রণে যেসব উপাদান থাকা
প্রয়োজন তা হচ্ছেঃ চাল ভাঙ্গা ৪ কেজি, ঢেঁকি ছাঁটা চালের কুড়া ৫ কেজি, খেসারি বা
অন্য কোনো ডালের ভূষি ৫০০ গ্রাম, ঝিনুকের গুড়া ২০০ গ্রাম এবং লবণ ৩০০ গ্রাম।
ইউরিয়া দ্বারা প্রক্রিয়াজাত খড় ও সাইলেজ খাওয়ালে ভাল হয়। কারণ প্রক্রিয়াজাত
খাদ্যে আমিষের পরিমাণ বেশি থাকে এবং পরিপাকও ভালোভাবে হয়। জন্মের পর থেকেই ছাগল
ছানাকে আঁশ জাতীয় খাদ্য যেমন কাঁচা ঘাস ইত্যাদিতে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তুলতে
হবে। দানাদার খাদ্য খাওয়ানোর পর ছাগলকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিষ্কার পানি খেতে দিতে
হবে। বাড়ন্ত ছাগলকে দৈনিক প্রায় ১ লিটারের মতো পানি পান করা উচিত। কাঁচাঘাস কম
বা এর অভাব ঘটলে ছাগলকে ইউরিয়া-চিটাগুড় মেশানো খড় নিম্নোক্ত প্রণালীতে বানিয়ে
খাওয়াতে হবে।
উপকরণঃ
২-৩ ইঞ্চি মাপের কাটা খড়
১ কেজি, চিটাগুড় ২২০ গ্রাম, ইউরিয়া ৩০ গ্রাম ও পানি ৬০০ গ্রাম। এবারে পানিতে
ইউরিয়া গুলে তাতে চিটাগুড় দিয়ে খড়ের সাথে মিশিয়ে সরাসরি ছাগলকে দিতে হবে।
খাসীর ক্ষেত্রে তিন-চার মাস বয়সে দুধ ছাড়ানোর পর নিয়মিত সঠিকভাবে এই
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাওয়ালে দৈনিক ৬০ গ্রাম করে দৈহিক ওজন বাড়ে ও এক বছরের
মধ্যে ১৮-২২ কেজি ওজন প্রাপ্ত হয়ে থাকে। খাসীকে দৈহিক ওজনের উপর ভিত্তি করে মোট
ওজনের ৭% পর্যন্ত পাতা বা ঘাস জাতীয় খাদ্য দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ (চাল ভাঙ্গা
৪০%, কুড়া ৫০%, ডালের ভূষি ৫৫, লবণ ৩% এবং ঝিনুকের গুড়া ২%) ১০০ গ্রাম থেকে
সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম ও ভাতের মাড় ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত খেতে দেয়া যেতে পারে। খাসীর
ওজন ২০ কেজির বেশি হয়ে গেলে এদের দেহে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই এ সময়েই
এদেরকে বাজারজাত করা উচিত। ছাগল খামারের খাদ্য খরচ মোট খরচের ৬০-৭০% হওয়া আবশ্যক।
বাণিজ্যিক খামারের লাভ-লোকসান তাই খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। নিম্নে
বাণিজ্যিকভাবে পালিত ছাগলের দানাদার খাদ্যের সাধারণ মিশ্রণ প্রদত্ত হলঃ
ছাগলের বাচ্চার বয়স
অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহের পরিমাণ
বাণিজ্যিক ছাগলের দানাদার
খাদ্যের সাধারণ মিশ্রণ
অন্যান্য ব্যবস্থাপনাঃ
সঠিক অনুপাতে (১০ টি
ছাগীর জন্য ১টি পাঠাঁ) ছাগী ও পাঠাঁ পালন করতে হবে। পাঠাঁ এবং ছাগীকে কখনও একত্রে
খাদ্য খেতে ও মাঠে চরানো যাবে না, কারণ পাঠাঁ ছাগীকে খাদ্য খেতে অসুবিধার সৃষ্টি
করে এবং অনেক সময় মারামারি করে ক্ষতের সৃষ্টি করে থাকে। প্রজননক্ষম পাঠাঁ ছাগীকে
নিয়মিত (বছরে ৫-৬ বার) ০.৫% মেলাথিয়ন দ্রবণে চুবিয়ে বহিঃপরজীবী থেকে মুক্ত
রাখতে হবে। বাচ্চার ক্ষেত্রে যাতে উক্ত দ্রবণ নাকে বা কানে যেন প্রবেশ করতে না
পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। (গর্ভের ১ম মাসে ১-১.৫ মিলি ভিটামিন এ.ডি.ই এবং
গর্ভের শেষ দুই সপ্তাহে ১-১.৫ মিলি ৪৮ ঘন্টা পরপর ইনজেকশন দিতে হবে)। প্রসবের
লক্ষণ দেখা দিলে ছাগীর পিছনের অংশ ও ওলান পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এর ০.৫-১%
দ্রবণ দিয়ে ধুয়ে মুছে দিতে হবে। বাচ্চা প্রসবের পর জীবাণুমুক্ত সার্জিক্যাল চাকু
বা ব্লেড দ্বারা নাভি ২-৩ সেঃমিঃ রেখে বাকি অংশ কেটে দিতে হবে। (এ সময় ছাগীর
জরায়ুতে যাতে ইনফেকশন না হয় সেজন্য পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গনেট দিয়ে ধুয়ে দিতে
হবে এবং এরপর ক্যাপলেট (মাত্রাঃ১ ক্যাপলেট/১০-২০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য) অথবা
বোলাস (মাত্রাঃ ১-২ বোলাস) জরায়ুতে দিতে হবে)। প্রসবের ২৪ ঘন্টা পরও ফুল বা
প্লাসেন্টা না পড়লে অক্সিটোসিন (মাত্রাঃ ১-২ মিলি/ ১০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য)
ইনজেকশন দিতে হবে। বাচ্চার বয়স যখন ৩-৫ সপ্তাহ তখন শিং ওঠা বন্ধ করা উচিত। বাচ্চা
বয়স ২-৪ সপ্তাহ হলে তাকে খাসী করানো উচিত।
খাসী করতে হলে টেবিল বা এ
জাতীয় উচু জায়গায় রেখে পিছনের পা দুটো টেনে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এরপর
অন্ডকোষকে ৩% টিংচার দ্রবণ দিয়ে ভাল করে মুছে দিতে হবে। অন্ডকাষকে চামড়ার
বিপরীতে চেপে ধরে চামড়ার নিচের দিকে একটি মাত্র পোচে কেটে অন্ডকোষ দুইটি বের করে
রগ (Spermatic cord) কেটে দিতে হবে। এরপর অন্ডকোষ থলিকে টিংচার অব আয়োডিন দ্বারা
পরিষ্কার করে ক্ষতস্থানে পাউডার লাগিয়ে দিতে হবে।
বাজারজাত করার প্রকৃত
সময়ঃ
এ প্রকল্পের সফলতা নির্ভর
করে পশুটির যর্থাথ ও উপযুক্ত দামের উপর। কাজেই বিক্রির জন্য যে বাজারে
তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্য পওয়া যাবে সেখানে ছাগল নেয়া যেতে পারে। তবে মূল্য বেশি
হবে এই ধারনায় ছাগলদেরকে দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটিয়ে বা গাড়িতে করে পরিবহন করা
যুক্তিযুক্ত নয়। অস্বাস্থ্যকর প্রতিকূল পরিবেশে এধরনের ভ্রমণের ফলে ছাগলের
ধকলজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং এর ফলে রোগাক্রান্ত হলে
খামারীর প্রভৃতি ক্ষতি হতে পারে। এজন্য বাজারজাত করণের প্রভূত ক্ষেত্রে কোনো
ঝুকিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে খামারীর নিজেরই সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করা উচিত।
★
ষ্টল ফিডিং পদ্ধতিতে ছাগল পালন
ষ্টল ফিডিং পদ্ধতিতে ছাগল
পালন
বাংলাদেশে ছাগল পালনের
ক্ষেত্রে সাধারণত ছাগলকে ছেড়ে বা মাঠে বেঁধে খাওয়ানো হয়। গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত
বিজ্ঞানভিত্তিক বাসস্থান, খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অনুসারে ছাগল পালনের
প্যাকেজ প্রযুক্তিকে স্টল ফিডিং পদ্ধতি বলা হয়।
স্টল ফিডিং পদ্ধতির
করণীয়ঃ
ছাগল নির্বাচনঃ এ
পদ্ধতিতে ছাগল খামার করার উদ্দেশ্যে ৬-১৫ মাস বয়সী স্বাভাবিক ও রোগমুক্ত ব্ল্যাক
বেঙ্গল জাতের পাঁঠা/ছাগী সংগ্রহ করতে হবে। পাঁঠার বয়স ৫-৭ মাস হতে পারে।
ছাগলের ঘরঃ স্টল ফিডিং
পদ্ধতিতে প্রতিটি বয়স্ক ছাগলের জন্য প্রায় ১০ বর্গফুট ঘরের জায়গা প্রয়োজন। ঘরটি
বাঁশ, কাঠ বা ইটের তৈরী হতে পারে। শীতের রাতে ঘরের বেড়া চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং
মেঝেতে খড় বিছিয়ে দিতে হবে।
ছাগলকে ঘরে থাকতে অভ্যস্ত
করানোঃ ছাগল সংগ্রহের সাথে সাথেই সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় রাখা উচিত নয়। প্রথমে
ছাগলকে দিনে ৬-৮ ঘন্টা চরিয়ে বাকী সময় আবদ্ধ অবস্থায় রেখে পর্যাপ্ত খাদ্য (ঘাস ও
দানাদার খাদ্য) সরবরাহ করতে হবে। এভাবে ১-২ সপ্তাহের মধ্যে চরানোর সময় পর্যায়ক্রমে
কমিয়ে সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় রাখতে হবে। তবে বাচ্চা বয়স থেকে আবদ্ধ অবস্থায় রাখলে
এ ধরনের অভ্যস্ততার প্রয়োজন নেই।
বাচ্চার পরিচর্যাঃ জন্মের
পরপরই বাচ্চাকে পরিষ্কার করে শাল দুধ খাওয়াতে হবে। এক মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে দিনে
১০-১২ বার দুধ খাওয়াতে হবে। বাচ্চার চাহিদার তুলনায় কম দুধ থাকলে প্রয়োজনে অন্য
ছাগী থেকে দুধ খাওয়াতে হবে। তাছাড়া দুধ না পাওয়া গেলে বাচ্চাকে মিল্ক রিপেৱসার
খাওয়াতে হবে। দুধ খাওয়ানোর আগে ফিডার, নিপলসহ আনুসাংগিক জিনিসপত্র পানিতে ফুটিয়ে
জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। ১-১.৫ কেজি ওজনের একটি ছাগল ছানার দৈনিক ২৫০-৩৫০ গ্রাম
দুধ প্রয়োজন। ওজন বৃদ্ধিও সাথে সাথে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। বাচ্চার বয়স
৬০-৯০ দিন হলে দুধ ছেড়ে দেবে। সাধারণত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগীকে প্রয়োজনমত খাওয়ালে
বাচ্চার প্রয়োজনীয় দুধ পাওয়া যায়। বাচ্চার ১ মাস বয়স থেকেই ধীরে ধীরে কাঁচা ঘাস
এবং দানাদার খাদ্যে অভ্যস্ত করতে হবে।
স্টল ফিডিং পদ্ধতিতে
ছাগলকে খাওয়ানোঃ ছাগল সাধারণতঃ তার ওজনের ৪-৫% হারে খেয়ে থাকে। এর মধ্যে ৬০-৮০%
আঁশ জাতীয় খাবার (ঘাস, লতা, পাতা, খড় ইত্যাদি) এবং ২০-৪০% দানাদার খাবার (কুড়া,
ভূষি, চাল, ডাল ইত্যাদি) দিতে হবে। একটি বাড়ন্ত- খাসীকে দৈনিক ১-১.৫ কেজি কাঁচা
ঘাস এবং ২০০-২৫০ গ্রাম দানাদার খাবার (সারণী-১) দিতে হবে। দুই থেকে তিন বাচ্চা
বিশিষ্ট ২৫ কেজি ওজনের ছাগীর দৈনিক প্রায় ১.৫-২.৫ কেজি কাঁচা ঘাস এবং ৩৫০-৪৫০
গ্রাম দানাদার খাদ্য প্রয়োজন হয়। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক পাঁঠার দৈনিক ১.৫-২.৫ কেজি
কাঁচা ঘাস এবং ২০০-৩০০ গ্রাম দানাদার খাদ্য প্রয়োজন।
সারণী-১: ছাগলের দানাদার
খাদ্যের সাধারণ মিশ্রন (%)
খাদ্য উপাদান শতকরা
হার (%)
চাল/গম/ভুট্টা
ভাঙ্গা ১২.০০
গমের ভূষি/আটা/কুঁড়া ৪৭.০০
খেসারী/মাসকালাই/অন্য
ডালের ভূষি ১৬.০০
সয়াবিন/তিল/নারিকেল/সরিষা/খৈল ২০.০০
শুটকি মাছের গুড়া ১.৫০
ডাই-ক্যালসিয়াম ফসফেট ২.০০
লবণ
১.০০
ভিটামিন মিনারেল
প্রিমিক্স ০.৫০
বিপাকীয় শক্তি
(মেগাজুল/কেজি) ১০.০০
বিপাকীয় প্রোটিন
(গ্রাম/কেজি) ৬২.০০
ছাগলের জন্য ঘাস চাষঃ ঘাস
সরবরাহের জন্য বিভিন্ন জাতের দেশী ঘাস খাওয়ানো যায়। ইপিল ইপিল, কাঁঠাল পাতা,
খেসারী, মাসকালাই, দুর্বা, বাকসা ইত্যাদি দেশী ঘাসগুলো বেশ পুষ্টিকর। এছাড়া উচ্চ
ফলনশীল নেপিয়ার, স্পেনডিডা, এন্ড্রোপোগন, পিকাটুলুম ইত্যাদি ঘাস আবাদ করা যেতে
পারে।
ছাগলকে খড় খাওয়ানোঃ ঘাস
না পাওয়া গেলে খড়কে ১.৫-২.০ ইঞ্চি (আঙুলের দুই কর) পরিমানে কেটে নিমেড়ব বর্ণিত
পদ্ধতিতে পক্রিয়াজাত করে খাওয়ানো যেতে পারে। এজন্য ১ কেজি খড়ের সাথে ২০০ গ্রাম
চিটাগুড়, ৩০ গ্রাম ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম পানির সাথে মিশিয়ে ইউএমএস তৈরী করে খাওয়ানো
যেতে পারে। এর সাথে এ্যালজি উৎপাদন করে দৈনিক ১-১.৫ লিটার পরিমানে খাওয়াতে হবে।
একটি ছাগল দৈনিক ১.০-২.০ লিটার পানি খায়। এজন্য পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে
হবে।
পাঁঠার ব্যবস্থাপনাঃ যেসব
পাঁঠা বাচ্চা প্রজনন কাজে ব্যবহার করা হবে না তাদেরকে জন্মের ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে
খাসী করানো উচিত। পাঁঠাকে যখন প্রজনন কাজে ব্যবহার করা হয় না তখন তাকে পর্যাপ্ত
পরিমানে শুধু ঘাস খাওয়ালেই চলে। তবে প্রজনন কাজে ব্যবহারের সময় ওজন ভেদে ঘাসের
সাথে ২০০-৫০০ গ্রাম পরিমান দানাদার খাবার দিতে হবে। পাঁঠাকে প্রজননক্ষম রাখার জন্য
প্রতিদিন পাঁঠাকে ১০ গ্রাম পরিমাণ গাঁজানো ছোলা দেয়া উচিত। পাঁঠাকে কখনই
চর্বিযুক্ত হতে দেয়া যাবে না।
ছাগলের স্বাস্থ্য ও
অন্যান্য ব্যবস্থাপনাঃ সব ছাগলকে বছরে দু’বার (বর্ষার শুরু এবং শীতের শুরুতে)
কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। ছাগলের মারাত্মক রোগ, যেমনঃ পিপিআর, গোটপক্স হলে অতি দ্রুত
নিকটস্থ পশুহাসপাতালে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া ছাগলে তড়কা,
হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া, এন্টারোটক্সিমিয়া, বিভিনড়ব কারণে পাতলা পায়খানা এবং
নিউমোনিয়া হতে পারে। সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এ সকল রোগ
নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে সুস্থ ছাগলের জন্য একথাইমা রোগের
ভ্যাকসিন জন্মের ৩য় দিন ১ম ডোজ এবং ২য় ডোজ জন্মের ১৫-২০ দিন পর দিতে হবে, পিপিআর
রোগের ভ্যাকসিন ৪ মাস বয়সে এবং গোট পক্সের ভ্যাকসিন ৫ মাস বয়সে দিতে হবে।
জৈব নিরাপত্তাঃ খামারে
কোন নতুন ছাগল আনতে হলে অবশ্যই রোগমুক্ত ছাগল সংগ্রহ করতে হবে এবং ১৫ দিন খামার
থেকে দূরে অন্যত্র রেখে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোন রোগ দেখা না দিলে ১৫ দিন পর
পিপিআর ভ্যাকসিন দিয়ে ছাগল খামারে রাখা যাবে। অসুস্থ ছাগল পালের অন্য ছাগল থেকে
দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।
ছাগলের প্রজনন
ব্যবস্থাপনাঃ ছাগলের ঘর নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। সকল ছাগলকে বছরে ৫-৬ বার ০.৫%
ম্যালাথায়ন দ্রবণে চুবিয়ে চর্মরোগ মুক্ত রাখতে হবে। পাঁঠী ১২-১৩ কেজি ওজন (৭-৮ মাস
বয়স) হলে তাকে পাল দেয়া যেতে পারে। পাঁঠী বা ছাগী গরম হওয়ার ১২-১৪ ঘন্টা পর পাল
দিতে হয়। অর্থাৎ সকালে গরম হলে বিকেলে এবং বিকেলে হলে পরদিন সকালে পাল দিতে হবে।
পাল দেয়ার ১৪২-১৫৮ দিনের মধ্যে সাধারণত বাচ্চা দেয়। পাল দেয়ার জন্য নির্বাচিত
পাঁঠা সবসময় নিঃরোগ, ভাল বংশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের হতে হবে। ‘‘ইনব্রিডিং’’
এড়ানোর জন্য ছাগীর বাবা বা দাদা বা ছেলে বা নাতীকে দিয়ে প্রজনন করানো যাবে না।
ছাগলের বাজারজাতকরণঃ
সুষ্ঠু খাদ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় ১২-১৫ মাসের মধ্যে খাসি ২০-২২ কেজি ওজনের
হয়। এসময় খাসী বিক্রি করা যেতে পারে। অথবা খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাত করেও বিক্রি
করা যেতে পারে।
ছাগলের রোগবালাইঃ
ছাগলের রোগ বালাই :-
ছাগলের প্রধানত যে রোগ
গুলো বেশি হয় সে গুলো হলো
১। ছাগলের পি পি আর ২।
বসন্ত ৩। ক্ষুরা রোগের ৪। ওলান প্রদাহছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধবর্তমানে
বাংলাদেশে ছাগল পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা হল পি পি আর ।
★ ছাগলের পি পি আর রোগের
লক্ষণঃ • রোগের শুরুতে ১০৫-১০৭ ডিগ্রি ফাঃ জ্বর হয়, এর সাথে পাতলা পায়খানা শুরু হয়
। • ছাগলের নাক দিয়ে স্লেম্মা নির্গত হয় এবং নাকে ও মুখে ঘা হয় । • নাসারন্ধের
চারধারে স্লেম্মা জমে যায় । • গর্ভবর্তী ছাগলের গর্ভপাত ঘটে । • ছাগলের দাঁড়ানোর
ভঙ্গি অনেকটা কুঁজো হয়ে যায় ।
ছাগলের পি পি আর রোগের
প্রতিরোধঃরোগ হওয়ার পূর্বে সুস্থও ছাগলকে এ রোগের টিকা দিয়ে রোগ প্রতিরোধ করাই
সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা । ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পদক্ষেপ সমূহ পুরোপুরি মেনে চলতে
হবে । বাচ্চার বয়স ৪ মাস হলেই এ রোগের টিকা দিতে হবে ।
★ ছাগলের বসন্ত রোগের লক্ষণ
ও প্রতিরোধছাগলের সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে বসন্ত অন্যতম । এই রোগে ছাগলের চামড়া
নষ্ট হয়ে যায় । ছাগলের বসন্ত রোগের লক্ষণঃ • মুখের চারপাশ ও গহ্বরে, কানে, গলদেশে,
বাটে এবং পায়ু পথের চারপাশে বসন্তের গুটি দেখা দেয় । • দেহের তাপ বৃদ্ধি পায়, কিছু
খায় না ও জাবর কাটে না । • ছাগলের পাতলা পায়খানার সাথে মিউকাস ও রক্তের ছিটা দেখা
দেয় । • রোগ দ্রুত আশে পাশের ছাগলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । ছাগলের বসন্ত রোগের
প্রতিরোধঃরোগ হওয়ার পূর্বে সুস্থ ছাগলকে এ রোগের টিকা প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে উত্তম
ব্যবস্থা। ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পদক্ষেপ সমূহ পুরোপুরি মেনে চলতে হবে ।
★ ছাগলের ক্ষুরা রোগের
লক্ষণ ও প্রতিকারছাগলের ক্ষুরা রোগের লক্ষণঃ • ছগল আক্রান্ত হলে কাপুনি দিয়ে জ্বর
আসে । • মুখ থেকে লালা পড়তে থাকে । • মুখ ও পায়ে ফোস্কা দেখা দেয় এবং পরে ফেটে
গিয়ে ১৮-২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘায়ে পরিণত হয় । ছাগলের ক্ষুরা রোগের প্রতিকারঃসময়মত টিকা
দিতে হবে রোগাক্রান্ত ছাগলকে পৃথক করে রাখতে হবে । মৃত্যু ছাগলকে দূরে পুঁতে রাখতে
হবে । রোগাক্রান্ত ব্যবহৃত সামগ্রী গর্তে পুঁতে রাখতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে
★ ছাগলের ওলান প্রদাহ বা ম্যাসটাইটিস রোগের
লক্ষণ ও প্রতিরোধছাগলের ওলান প্রদাহ বা ম্যাসটাইটিস রোগের লক্ষণ সমুহঃ • গায়ে জ্বর
থাকে, ওলান ভীষণ গরম ও শক্ত হয়, বাটসহ ফুলে ওঠে । • বাট দিয়ে কখনও পাতলা আবার জমাট
বাঁধা রক্ত মিশ্রিত দুধ আসে । • এক পর্যায়ে বাঁটগুলো অত্যন্ত শক্ত হয়ে যায় এবং দুধ
বের হয় না । • অত্যধিক মারাক্তক অবস্থায় আক্রান্ত বাটে পচন ধরে ও এক পর্যায়ে বাট পচে
খসে পড়ে । ছাগলের ওলান প্রদাহ বা ম্যাসটাইটিস রোগের প্রতিরোধঃপরিষ্কার পরিচ্চন্ন স্থানে
রাখতে হবে । বাটে সময় যাতে ক্ষত সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে । আক্রান্ত হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিতে হবে ।
★কৃমি সমস্যা ও প্রতিকার
আমাদের খামারিরা গবাদিপশু
পালন করতে গিয়ে একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়, তা হলো পরজীবী বা কৃমি। কৃমি এক ধরনের
পরজীবী যা পশুর ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে। তারা পশুর অন্ত্রে, ফুসফুসে,
লিভারে, চোখে, চামড়ায় বাস করে ও পশুর হজমকৃত খাবারে ভাগ বসিয়ে পশুর ব্যাপক
ক্ষতিসাধন করে। অনেক কৃমি পশুর রক্ত চুষে ও আমিষ খেয়ে পশুকে দুর্বল ও
স্বাস্থ্যহীন করে ফেলে।
পরজীবী সাধারণত দুই
ধরনের-
১. দেহের ভেতরের পরজীবী
২. দেহের বাইরের পরজীবী।
এখন কথা হলো কৃমি হাত
থেকে ছাগলকে বাচাঁতে হলে আমাদের প্রাথমিক কিছু প্রদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের
ছাগলগুলোকে কৃমি বা পরজীবী থেকে মুক্ত রাখার উপায়গুলো হচ্ছে-
১) গবাদিপশুর বাসস্থানের
জন্য নির্ধারিত স্থানের মাটি শুষ্ক ও আশপাশের জমি থেকে উঁচু হওয়া প্রয়োজন। সম্ভব
হলে নদীনালা, খালবিল, হাওর-বাঁওড় থেকে দূরে করতে হবে।
২) গবাদিপশুর খামারের
আশপাশে যেন বৃষ্টির পানি এবং অন্যান্য বর্জ্য জমে না থাকে ।
৩) খামারের জন্য
নির্ধারিত স্থানের মাটিতে বালির ভাগ বেশি হওয়া প্রয়োজন যেন বর্ষাকালে খামারের
মেঝে কর্দমাক্ত না হয় ।
৪) পশুর মলমূত্র ও
আবর্জনা অল্প সময় পরপর পরিষ্কার করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ঘরে মলমূত্র ও
আবর্জনা জমা না থাকে।
৫) খামারের অনেক দূরে
পশুর মলমূত্র ও আবর্জনা পুঁতে রাখতে হবে।
৬) গবাদিপশুর বাসস্থান
প্রতিদিন আদর্শ ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে এবং জীবাণুনাশক মেশানো পানি দিয়ে
জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৭) তিন মাস অন্তর
গবাদিপশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে।
ছাগলের মিনারেল এর অভাব
জনিত কিছু রোগ :
১. সেলেনিয়াম :
পৃথিবীতে অনেক স্থানে
সেলেনিয়াম এর পরিমান কম এজাতীয় মাটি আছে
যেখানে ঘাস চাষ করলে সেই ঘাসে ও ভিটামিন ই এর অভাব থাকে। যার ফলে ওই স্থানের গবাদি
পশুর ভিটামিন ই অভাব জনিত রোগ দেখা
যায়। ভিটামিন ই অভাব জনিত রোগ হলো white muscle disease (nutritional muscular
dystrophy), বাচ্চা জন্মানোর পর পিছনের পায় দাঁড়াতে না পারা বা দুর্বল হওয়া,
বাচ্চা জন্মানোর পর দুর্বল মাংস পেশীর
কারণে নিউমোনিয়া হওয়া জোরে জোরে শ্বাসপ্রস্বাস করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বাচ্চা
হওয়ার পরপর সেলেনিয়াম ভিটামিন E ইনজেকশন দিতে হবে।
২. জিঙ্ক :
জিঙ্ক এর অভাব জনিত রোগ
এবং লক্ষণ মুখ থেকে লালা পড়া, খুড়ার আকৃতি অস্বাভাবিক হওয়া, পায়ের গিট এ ব্যাথা
হওয়া, চামড়া বিভিন্ন ধরণের রোগ, পাঠার অন্ডকোষ ছোট আকৃতির হওয়া, ক্রস করতে আগ্রহী
না হওয়া ইত্যাদি।
৩. কপার :
কপার ছাগলের জন্য খুবই
গুরুত্বপূর্ণ মিনারেল। কপার অভাব জনিত রোগ পশম এর রং ফ্যাকাশে হওয়া, বাচ্চা পরে
যাওয়া, মরা বাচ্চা হওয়া, রক্ত শূন্যতা, হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, ক্ষুদা মন্দা, ওজন কমে
যাওয়া, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া। কপার ভেড়ার জন্য খুবই ক্ষতিকর কিন্তু ছাগলের জন্য
অত্তন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পর্যাপ্ত নাহলে
উপরোক্ত রোগ গুলি হতে পারে। তাই উন্নত দেশে ছাগলকে বছরে একবার কপার বোলাস দেয়া হয়
যা কিনা পেটে গিয়ে ছড়িয়ে পরে এবং কপার গুঁড়া গুলো আস্তে আস্তে গলতে থাকে। এধরণের
একটি বোলাস এক বছর পর্যন্ত কাজ করে।
৪. আয়রন :
আয়রন খুব একটা দরকার হয়না
কিন্তু যদি ক্রেমি আক্রম করে তবে আয়রন খুবই জরুরি মিনারেল। যাকিনা রক্ত শূন্যতা
থেকে রক্ষা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আয়রন
ইনজেকশন ও দিতে হতে পারে।
৫. আয়োডিন :
এর অভাবে গলগন্ড রোগ হতে
পারে। প্রতিদিন খাবারে ১% আয়োডিন যুক্ত লবন থাকা জরুরি।
৬. ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস
:
ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস
অনুপাত ২:১ হওয়া খুব জরুরি, এর কম বেশি
হলে পাঠার প্রস্রাবের রাস্তা বাধা গ্রস্থ হবে (urinary calculi)। কোনো কোনো
ক্ষেত্রে ছাগল মারা পর্যন্ত যায়। তাছাড়া বাচ্চা জন্মের সময় বিভিন্ন সমেস্যা
দেখাযায়, হাড়ের গঠন সুগঠিত হতেপারে না। দানাদার খাবারে ফসফরাস এর পরিমান অনেক বেশি
তাই দানাদার খাবার বেশি দিলে অবশ্যই ক্যালসিয়াম এর মাত্রা বাড়াতে হবে। যারা ঘাস
চাষ করতে মুরগির লিটার ব্যবহার করেন তাদের ও এই ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি কারণ
মুরগির লিটার এ ফসফরাস বেশি থাকে যা ফসলের ফসফরাস এর পরিমান বাড়িয়ে দেয়।
৭. ম্যাঙ্গানিজ :
ম্যাঙ্গানিজ এর অভাব এ
বাচ্চার গ্রোথ কমে যায়, কনসিভ % কমে যায়, বাচ্চা সময়ের আগে পরে যায় বা এবরশন হয়।
পায়ের গঠন ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং হাটতে সমস্যা হয়। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম ম্যাঙ্গানিজকে
শরীরে শোষণ করতে বাধা দেয়।
ভিটামিন A :
ভিটামিন A এর অভাবে নাক
দিয়ে ঘন সর্দি বের হবে, শ্বাস প্রশ্বাসে প্রব্লেম হবে, ডায়রিয়া, লোম অগুছালো, চোখে
কম দেখা, বন্ধা বা গাভিন না হওয়া, খুব সহজে রোগাক্রন্ত হওয়া ইত্যাদি।
ভিটামিন B :
যেকোনো গরু ছাগল ভেড়া
অসুস্ত হওয়ার পর দুর্বলতা কাটাতে Vitamin B1 (thiamine) খুব জরুরি। খাওয়া কমে গেলে, ঘাড় বাঁকা, পায়ে সমস্যা পোলিও
, চোখের মনি ঘুরতে থাকা, অরুচি, লিভার ইত্যাদি সমস্যা জন্য Vitamin B1 (thiamine)
খুব উপকারী।
ভিটামিন D :
জয়েন্ট এ ব্যাথা, বাঁকা পা bowed legs (rickets) জন্য সেই সাথে
যখন ক্যালসিয়াম দেয়া হয় তখন D ব্যবহার করা উচিৎ। ষ্টল ফিডিং ছাগলকে নিয়মিত ভিটামিন
D দেয়া উচিৎ।
ভিটামিন E :
যারা নিয়মিত silage এবং
খড় খাওয়ান তাদের নিয়মিত ভিটামিন E খাবারে দিতে হবে।
গরু ছাগলের ধনুষ্টংকারঃ
প্রতিষেধক, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা।
.
#ধনুষ্টংকার কি?
ধনুষ্টংকার হল এক প্রকার
বিষ দ্বারা সৃষ্ট রোগ যার জন্য Clostridium Tetani নামক ব্যকটেরিয়া দায়ী। এই
ব্যকটেরিয়া মাটি, মানুষ ও প্রাণির পাকস্থলীতে বসবাস করে।
.
#ধনুষ্টংকার কেন এবং কিভাবে হয়ঃ
শরীরের কোন অংশ কেটে
গেলে, ছিঁড়ে গেলে বা থেতলে গেলে বা যেকোন ভাবে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হলে উক্ত স্থানে
Clostridium Tetani নামক ব্যকটেরিয়াটি বাসা বাধে। উক্ত স্থানে কোন ভাবে অক্সিজেনের
অভাব দেখা দিলে ব্যকটেরিয়া দ্রুত বংশ বিস্তার করে ও ইনফেকশন তৈরি করে। এবং
ব্যকটেরিয়া গুলো বিষ সৃষ্টি করে যা নার্ভে ছড়িয়ে পড়ে এবং মস্তিস্কে পৌছানোর পরপরই
ধনুষ্টংকারেরর ক্লিনিক্যাল লক্ষণ গুলো ধরা পড়ে।
.
#ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার সময় ও বয়সঃ
ধনুষ্টংকারে যেকোন বয়সের
যে কোন প্রাণি আক্রান্ত হতে পারে। তবে খুজা করণ, বয়সে ছোট ও বাচ্চা প্রসব পরবর্তি
সময়ে মায়ের ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে।
.
#ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার সময়কালঃ
ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া
টিস্যুতে ব্যকটেরিয়া ইনফেকটেড হওয়া ও ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়
খুবই কম। ব্যকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই ধনুষ্টংকার
দেখা দেয় তবে কখনও কখনও তিন সপ্তাহ বা তারও অধিক সময় লাগতে পারে। এটি নির্ভে করে
আক্রান্ত স্থানে অক্সিজেন উপস্থিতির উপর ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর।
.
#প্রতিষেধকঃ
ধনুষ্টংকার প্রতিরোধেরর
জন্য নিদিষ্ট মাত্রায় ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তিন ডোজ
ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে তিন বছরের চন্য নিশ্চিত থাকা যায়।
.
#প্রতিরোধঃ
সাধারণ কিছু বিষয় মেনে
চললেই ধনুষ্টংকার প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমনঃ
১. কোন কারণে শরীরের
টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হলে আক্রান্ত স্থান সব সময় পরিষ্কার করে রাখতে হবে।
২. কোন মতেই আক্রান্ত
স্থানটি মাটির সংস্পর্শে না লাগা।
৩. নিয়মিত ভাবে
এন্টিসেপটিক দ্বারা ধৌত করা।
৪. আক্তান্ত স্থান কোন
ভাবেই শক্ত ভাবে ব্যান্ডেজ না করা এবং ব্যান্ডেজ দীর্ঘদিন না রাখা। এতে অক্সিজেন
ঘাটকি দেখা দিবে এবং Clostridium Tetani নামক ব্যাকটেরিয়াটি সহজে দ্রুত বংশ
বিস্তারের সুযোগ পাবে।
৫. যে কোন কাটা বা
অপারেশনের জন্য বা ইনজেকশনের জন্য সুই অবশ্যই জীবানুমুক্ত ও পরিষ্কার হতে হবে।
.
ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ সমূহঃ
১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
লক্ষণ হল পা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং নিজের ইচ্ছা মাফিক চলা ফেরা বরতে না পারা।
২. মাংস পেশী সমূহ খিচতে
থাকা ও পেশি সমূহ কাঁপতে থাকা।
৩. চোয়াল শক্ত হয়ে যাওয়া
অর্থাৎ খিল লাগা।
৪. চোখের ভিতরে পাতা
(Third Eyelid) বেরিয়ে আসা।
৫. ঝিমাইতে থাকা এবং হঠাৎ
করে লাফালাফি শুরু করা।
৬. পেট ফুলে থাকা। কারণ
এই সময়ে হজম ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
৭. সর্বশেষ হাত পা ও ঘাড়
কলাপ্স করা, পেশি নরম, শরীরের বিভিন্ন শক্ত হয়ে যাওয়া অঙ্গ স্বাভাবিক মনে হওয়া।
সর্বশেষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া।
.
#চিকিৎসাঃ
সকল প্রকার চিকিৎসার জন্য
রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

sundor hyece vi
ReplyDeleteThanks
Delete