অস্পৃশ্য ভাবানুভূতি

কখনো আবেগ, কখনো বাস্তবতা। কখনো সত্য, কখনো মরীচিকা । একটা সময় ছিল পুরোটা আবেগময়, বাস্তবতায় ফিরতে অনেক কষ্ট হয়েছে। এখান থেকেই শুরু নতুন জীবন। এখান থেকেই বাস্তবতারর হাত ছানি। তবে এখানেও থেমে নেই, আবার সেই আবেগ আর ভন্ড মরীচিকা। আবেগ আর বাস্তবতার মধ্যে খুব বড় একটা ফারাক রয়েছে। নিজের আবেগের কাছে অনেক সময় নিজের বাস্তবতাটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। নিজের চোখের দেখা মনের ভাবনাগুলো যে ভুল হতে পারে তা আমরা ভুলে যাই। আবেগের তাড়নায় আমরা আমাদের মনের ভাবনাগুলো পূরণের জন্য খুব উদ্দমের সহিত কাজ শুরু করে দিই। কিন্তু যখন আবেগুলোকে কেউ পূরণ হতে দেয় না কিংবা প্রকৃত বাস্তবতা ফিরে আসে তখন আমরা খুব কষ্ট পাই। এভাবে ভাবতে ভাবতে মনের কষ্টগুলো আরও বাড়তে থাকে। আসলেই আবেগ থেকে বাস্তবাতায় ফেরা আসলেই অনেক কঠিন।
রাজ্যটা সঠিক আর সত্য হলেও কল্পনায় মিশে আছে সেই আবেগ, যা মরীচিকার নামান্তর, যা কোন কালেই মিলবে না, স্পর্শও করা যাবেনা। কারণ আবেগ দিয়ে কোন দিন কিছু হয় নি। আবেগ দিয়ে যে কল্পনা হয়েছে তার যুক্তি অনেক আছে কিন্তু কল্পনার লব্ধ ফল কি খাটি হবে? হয়তো হবে, নয় তো না! কল্পনার বাস্তবায়ন এখনো অনেক দীর্ঘ পথের, অনেক দূরের। হয়তো কল্পনাকারী চেয়েছে কল্পনারস গুলো খুব পরিচিত স্বাদের হবে, সহজেই মানিয়ে নিবে, নতুন করে মানিয়ে নিতে হবে না, অনেকটা বোতলজাত খাবারের মত। শুধু একটু আধটু প্রসেস করে খেয়ে নিবে।। খুব চিন্তার সময় আর চিন্তার বিষয়! কল্পনা গুলোতে যখন বিষফোঁড়গুলো উঁকি দেয়, তখন কল্পনাকারী শুধু চিন্তা করবে আর কষ্ট পাবে। না পারছে সরে যেতে, না পারছে মেনে নিতে, কেননা কল্পনার বস্তুটাকে এখনো চিনে নিতে পারছে না সে। ঠকবে না জিতবে? শুধুই অপেক্ষা.....! তবে প্রশ্নবিদ্ধ হল তখনি, যখন কথা উঠল কল্পনার বস্তুটিকে নিয়ে চলবে থাকবে সেই বহুদুরের পথ, নাকি কল্পনাবস্তুকে ফেলে দিয়ে দূরের পথে পৌঁছে বলবে, "অনেক হয়েছে কল্পনা, এবার বাস্তবে রুপ নাও।"
অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয় অপেক্ষা করতে। অপেক্ষা, সে তো দূরের পথ!! অপেক্ষার সময়গুলো মনের স্মৃতি গুলোকে মনে করিয়ে দেয়। স্মৃতিগলো একসময়ের বাস্তব আর সত্য হলেও বর্তমানের অপেক্ষারত দিনে ফিরে পাবার ব্যাকুলতা। মানুষেরা বলে অপেক্ষার ফল নাকি মিষ্টি হয়, অনেক মিষ্টতায় ভরা থাকে। সেজন্য অপেক্ষায় দণ্ডায়মান মানুষগলো অনেক আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মিষ্টিস্বাদ নিতে। কি দিয়ে মাপতে হয় এই স্বাদ তা জানা নেয়, কিন্তু মিষ্টতা যে কেমন হয় সেটা অনুভব করবে।
অপেক্ষাশেষে যখন কল্পনা আবার ফিরে আসে তখন প্রশ্ন তোলা হয় মাথার নাট বল্টু কি আসলেই ঢিলা হয়ে গেল কিনা? আসলে বিষয়টা তেমন না। এই মহাজাগতিক পৃথিবীতে মানুষের সময়গুলো তার নিজস্ব স্বত্বার মধ্যে ফুটে উঠে। কখনো বিষণ্ণতা, কখনো আবার প্রশান্তি। আর এটার জন্য দায়ী নার্ভ রেগুলেশন আর কিছু হরমোনের কাজ। আর এই বিষয় গুলোতে মানুষের কিছু করার থাকে না। শুধু অবস্থার পরিবর্তন হয়। সামাজিকতার কারণে আমরা এগুলো প্রকাশ করি অন্যের কাছে। প্রকাশিত অনুভূতি গুলো কেউ সহজে বলতে কিংবা বুঝাতে পারে। আবার কেউ কিছু কঠিন শব্দ, সাথে কিছু উপমা, রুপক দিয়ে কিংবা আংশিক প্রকাশ করতে গিয়ে বিষয়টাকে কঠিন করে তুলে। আর তখন অপরের কাছে বিষয় কোন আগামাথা থাকে না। তখনই বলা হয় 'মাথার নাট-বল্টু ঢিল হয়ে গেছে। কিন্তু এটা অবশ্যই মানতে হবে বিষয়টি খুবই সায়েন্টিফিক। কেননা আমরা মানুষ। মানুষ তো মানুষই। মানুষ আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা, মায়া কিংবা কষ্ট, সাথে চলমান পথের বন্ধুরতা সহ নানা বেড়া জালে বন্দি। আর সেজন্য মানব স্বত্বারর এই পরিবর্তন গুলো অন্যের কাছে প্রতীয়মান হয়, যা পুরোটাই সময় আর প্রেক্ষাপটের সৃষ্টি।
তবে এখানেই শেষ না। জীবনটা হল সাপ লুডুর খেলা। একবার দংশন করলে ফিরে যেতে হবে পূর্বেকার জায়গায়। আর তখন থেকেই শুরু হয় স্বপ্নগগুলো না পূরণের ভয়। মানুষ স্বপ্ন দেখে, জীবনে অনেক আশা করে, কিছু পাবার জন্য চেষ্টা করে, অনেক কষ্ট সহ্য করে। তবুও জীবনে অনেক দেনা পাওনা থেকে যায়। আগামীর পথগুলো যাতে সুন্দর আর মসৃন হয়, সে জন্য মানুষ আরেকটু ব্যাকুল হয়ে পড়ে। স্বপ্নগুলো যখন নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে তখন এপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার অন্তরে শুধু একটা কথাই বাজে, "স্বপ্ন যাবে বাড়ি।" কিন্তু তার বাড়ি যাবার রাস্তায় হাটতে কেন জানি একটু ভয় লাগছে। রাস্তার পীচ গুলো প্রখর রোদে গলতে শুরু করেছে আর ইট পাথর গুলো বের হতে শুরু করছে। রাস্তায় এখন নাকি দূর্ঘটনাপ্রবণ সাইন বোর্ড ঝুলানো। আবশেষে ভয় আর রাগের সৃষ্টি। কেননা একটা সিদ্ধান্ত যখন নিয়ে ফেলা হয়েছে তখন যদি কেউ সেখানে ভাগ বসাতে আসে তখন খুব কষ্ট হয়, টেনশন হয়, ভয় লাগে যদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হয়। এখন কল্পনাকারী সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। কারণ আমরা জানি বিদায় নেয়াটা অনেক সময় কষ্টের হয়ে যায় যখন অনেক গুলো ইমোশন জড়িয়ে যায়। আর যখন বিদায় হয়েই যায় তখন ফোঁটা বিহীন পানি শুন্য কান্না শুরু হয়। সেটা কেবল অন্তরেই থাকবে। গড়িয়ে পড়বে না কখনোই।
কল্পনা এখন যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াচ্ছে। তার কাজ গুলো ভূল না ঠিক, সে বুঝে না। কেউ যে তাকে বলে দিবে কোনটা সঠিক আর কোন ভূল, তারও কোন উপায় নেই। এখন কল্পনাকারী পড়েছেন বিপাকে। কেননা যারা অনধিকার প্রবেশ কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ দুটোকে পছন্দ করে না, তারা শুধু নীরবে কীর্তিকলাপ দেখে যায়। কিছু বলবে না....। হয়তো কিছু কষ্ট অনুভব করবে অন্তরে, এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারেনা। মন চাইলেও পারে না কাউকে ভাল কিছু বুঝাতে। মাঝেমধ্যে ভাল কিছু বুঝাতে তীব্র ইচ্ছা হলেও একটা ভয় মনের মধ্যে ডানা বাধে...। যেটুকু আছে সেটুকুও যদি হারিয়ে ফেলে...! তাই এই নিরবতা।
সমস্তকিছুই আবেগ! কি হবে এতো আবেগ দিয়ে? আবেগ কি নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ নয়? সব যদি বুঝার ক্ষমতা থাকে তাহলে বারে বারে আবেগের ফাঁদে পা পড়ে কেন? তবে এটা মানতে হবে, অনেকসময় আবেগই মানুষকে বেঁচে থাকার পথ দেখাই।
উড়ো পথে খবর আসে কল্পনাও নাকি অপেক্ষা করে! তবে কেন এই অপেক্ষা? কার জন্য এই অপেক্ষা? আর অপেক্ষাটা হচ্ছেই বা কোথায়? শুধু উত্তরে এলো, এই জীবনে কিছু অপেক্ষা! ভীষণ হাসি পাচ্ছে!
অপেক্ষা.....! সবাই অপেক্ষা করে। সবার জীবনে অপেক্ষা আসে। সবাই অপেক্ষা করে তার প্রত্যাশিত কিছু জিনিস পাবার জন্য। অপেক্ষারত সময়গুলো আর প্রত্যাশিত জিনিসগুলোর মধ্যে অব্যশ্যই যোগাযোগ থাকে। মানুষ একটা পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষার দোয়ার খোলে। সব সময়ই অপেক্ষার বিষয়বস্তু গুলো মানুষের অন্তরে স্বপ্ন রূপে জমা থাকে। আর যখন অপেক্ষার স্বপ্ন গুলো একই প্রজাতির মধ্যে হয়, তখন যার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে হয়তোবা সেও অপেক্ষায় থাকে! সময় আর প্রেক্ষাপটের চাহিদায় এই অপেক্ষার ফল নির্ধারিত হয়। অপেক্ষারত সময় অনেক দীর্ঘ হয় বলে মানুষ এই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। বিলীন হয়ে যায় তার জীবনের কিছু মূল্যবান সময়। তবুও কেউ অপেক্ষা ছাড়ে না। কারণ মানুষের প্রত্যাশিত বস্তু ছাড়া জীবন চলে না। সেজন্য মানুষ বরাবরি অপেক্ষারত তীর্থের কাকের চাতক চাহনি নিয়ে বসে থাকে।

Comments